সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ কিভাবে ঘটে?

সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের মাঝে রয়েছে নানান কল্প কাহিনী। আমেরিকান, ইউরোপিয়ান এবং চৈনিক সভ্যতায় এখনো অনেকে বিশ্বাস করে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ এর কারণ ড্রাগন।

অ্যাজটেক সভ্যতায় বিশ্বাস করা হতো চন্দ্রগ্রহনের সময় চাঁদের এক টুকরো খেয়ে ফেলা হয়। গ্রহন নিয়ে আমাদের সমাজে এখনও নানান কুসংস্কার বিদ্যমান আছে। আমাদের সমাজে চন্দ্র বা সূর্যগ্রহনের সময় সবচাইতে ভয়ে থাকে অন্তঃস্বত্তা মায়েরা। অনেকেই মনে করেন এই সময় অন্তঃস্বত্তা মায়েরা কোন কিছু কাটলে সন্তানের অঙ্গহানি হয় বা কাত হয়ে শুয়ে থাকলে সন্তান বিকলাঙ্গ হয়।

এই কুসংস্কার গুলো নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে কাদা ছুড়াছুড়ি যেন বন্ধই হচ্ছেনা। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে অন্য কথা। সূর্য এবং চন্দ্র গ্রহন খুবই স্বাভাবিক দুটি প্রাকৃতিক ঘটনা। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে,

কেন হয় সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহন?

আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা একটা জিনিশ স্পষ্ট জানি যে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘুরছে এবং পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে চাঁদ। তাদের এই ঘূর্ণনের কারনে কোন কোন সময় সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী একই সরলরেখায় চলে আসে। যার ফলে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহনের মত মহাজাগতিক ঘটনা ঘটে।

সূর্যগ্রহন চন্দ্রগ্রহনের চেয়ে বেশি হয়। স্বাভাবিক ভাবে বছরে দুইটি চন্দ্র গ্রহন হয় এবং মাঝে মধ্যে হয়ও না এমনকি কোন কোন বার তিনবার হয়ে যায়। সূর্যগ্রহন বছরে দুই থেকে পাঁচবার হয়। তবে পাঁচবার খুব কমই হয়। ১৯৩৫ সালে শেষ ৫ বার সূর্য গ্রহন হয় এবং ২২০৬ সালে আবার এক বছরে পাঁচটি সুর্যগ্রহন দেখবে পৃথিবী।

সূর্যগ্রহন

চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর মাঝে চলে আসে তখন সূর্যগ্রহন হয়। চাঁদ যখন পৃথিবী ও সূর্যের মাঝে চলে আসে তখন পৃথিবী থেকে চাঁদের জন্য সূর্যের আংশিক বা পুরো অংশ দৃশ্যমান হয় না। যেটাকে আমরা বলে থাকি সূর্যগ্রহন। চাঁদ সূর্যের সামনে থাকায় সূর্যের আলো পৃথিবীতে আসতে বাধাগ্রস্ত হয়, এজন্য সূর্যগ্রহনের সময় পৃথিবী কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে।

সূর্যগ্রহন তিন প্রকারের হতে পারে। ১। আংশিক সূর্যগ্রহন। ২। পূর্ণ সূর্যগ্রহন। ৩। বলয় গ্রহন।

পূর্ণ সূর্যগ্রহন চাঁদ যখন সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে তখন সেটা পূর্ণ সূর্যগ্রহন। পৃথিবীর যে সকল স্থানের সাথে চাঁদ ও সূর্য একদম সরল রেখা বরাবর অবস্থান করা সেই সকল স্থান থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহন দেখা যায়। এসময় চাঁদ পৃথিবীর কাছে অবস্থান করে এবং সূর্য চাঁদ থেকে দূরে অবস্থান করে এবং এর স্থায়িত্বকাল বেশি হয়।

আংশিক সূর্যগ্রহণ  যে সকল স্থান থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহন দেখা যায় তার প্বার্শবর্তী এলাকা থেকে আংশিক সূর্যগ্রহন দেখা যায়। এসময় চাঁদের জন্য সূর্যের একটা ছোট অংশ ঢেকে যায়।

বলয় গ্রহণ চাঁদের যখন পৃথিবী থেকে দূরে কিন্ত সূর্য থেকে কাছে অবস্থান করে তখন চাঁদ সূর্যের সামনে এমন ভাবে আসে দেখে মনে হবে আকাশে একটা আগুনের রিং তৈরি হয়েছে অর্থাৎ মনে হবে চাঁদের পাশে একটা বলয় তৈরি হয়েছে তাই এটাকে বলা হয় বলয় গ্রহণ। বলয় গ্রহণের স্থায়িত্বকাল কম হয়।

চন্দ্রগ্রহণ

চাঁদ এবং সূর্যের মাঝে যখন পৃথিবী একই সরলরেখায় চলে আসে তখন সূর্যের আলো পৃথিবীর জন্য সরাসরি চাঁদের উপর পরে না। চাঁদ এবং সূর্যের মাঝে পৃথিবী এসে পরায় চাঁদের উপর পৃথিবীর ছায়া পরে। এজন্য পৃথিবী থেকে চাঁদের পুরো বা কিছু অংশ অদৃশ্যমান হয়ে যায়। এই ঘটনাকেই বলে চন্দ্রগ্রহণ।

সূর্য গ্রহণের মত চন্দ্রগ্রহণও প্রধানত তিন ধরনের হয়ে থাকে

পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর প্রচ্ছায়া (গ্রহ বা উপগ্রহের ছায়ার গাড় অংশ বা কেন্দ্রীয় অঞ্চল) যখন পুরো চাঁদের উপর পরে তখন তাকে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বলে। পূর্ণ চন্দ্রগ্রহন খুবই আকর্ষণীয় / ভয়ংকর সুন্দর কারণ এই সময় চাঁদ লাল দেখায়।

আংশিক চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর প্রচ্ছায়া যখন চাঁদের কোন একটি অংশের উপর পরে তখন সেটাকে আংশিক চন্দ্রগ্রহণ বলে। চাঁদের যে অংশের উপর ছায়া পরে সেই অংশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায় কিন্তু বাকি অংশ উজ্জ্বল থাকে।

উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ পৃথিবীর উপচ্ছায়া (প্রচ্ছায়ার আশে পাশের হালকা ছায়া) যখন চাঁদের উপর পরে তখন সেটাকে উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ বলে। উপচ্ছায়া চন্দ্রগ্রহণ এর সময় চাঁদের উজ্জলাতা কিছুটা কমে আসে। স্বাভাবিক ভাবে দেখলে মনেই হবে না চন্দ্রগ্রহণ। উপচ্ছায় চন্দ্রগ্রহণ অনেকটাই বিরল।

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ দুটি স্বাভাবিক মাহাজাগতিক ঘটনা। এর সাথে অলৌকিকতা বা ভৌতিক কিছুর সম্পর্ক নেই। তবুও হাজার বছর ধরে চলে আসা বিশ্বাস গুলো কিছু মানুষের মধ্যে থেকেই যাবে। কুসংস্কার গুলো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হবে।

কিন্তু চন্দ্র ও সূর্যগ্রহন তাদের নিয়ম মতই ঘটতে থাকবে যতদিন এই মাহাবিশ্বের শৃঙ্খলতায় কোন ব্যত্যয় ঘটছে। মানুষের বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে এই মহাজাগতিক ঘটনা গুলো ঘটা বন্ধ হবে না। এগুলো তার নিয়মে চলতেই থাকবে।

Mithun Das

অতি সুন্দর কিন্ত সংক্ষিপ্ত জীবনে সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকাটাই মূখ্য। কে জয়ী হলো কে হারলো সেটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে উপভোগ করাই শ্রেয়। রহস্যময় প্রকৃতির রহস্যের চাদরে আচ্ছাদিত এই মানবজীবনের শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চাই নিজের মত করে।
| Follow me on Facebook

This Post Has One Comment

  1. Ashiq Ahmed

    আমাদের গ্রামেও এগুলো নিয়ে প্রচুর কুসংস্কার প্রচলিত আছে। বুঝাতে গেলেও কেও বুঝেনা। তবে আশা করি একদিন এই কুসংস্কার গুলো সমাজ থেকে দূর হয়ে যাবে।

Leave a Reply