ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে যা ভাবছেন ঢাবি শিক্ষার্থী রাজীব

দিনে দিনে ধর্ষণ সমাজের এক ভয়াবহ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অতি শীঘ্রই এর লাগাম টানতে হবে, করতে হবে আমাদের পরিবার, সমাজ এবং দেশের সকল স্তর নারীর জন্য নিরাপদ। তা না হলে এরকম বীভৎস ঘটনা ঘটে যেতে পারে আপনার আমার খুব কাছের মানুষের সাথেও।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ৯ ধারার বিবৃতিতে দেয়া হয়েছে ধর্ষণ এবং এ জনিত মৃত্যুর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই আইনের বাস্তবায়ন হয়েছে কতটুকু? আর তাছাড়া এটিই কি ধর্ষণ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়? উত্তর আসবে- না। কেননা শুধুমাত্র শাস্তির বিধান দিয়ে ধর্ষণকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। ধর্ষণের কঠোর শাস্তি শুধু সংবিধানে লিপিবদ্ধ না রেখে এর প্রয়োগ ঘটাতে হবে। সরকারী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দেশের প্রতিটি জনগণকে একযোগে ধর্ষণ প্রতিরোধ করার জন্য কাজ করতে হবে, সোচ্চার হতে হবে। কিন্তু প্রথমে জনসচেতনতা বাড়াতে ধর্ষণ প্রতিরোধ এবং নির্মুল করার জন্য এর কারনগুলো সম্পর্কে আমাদের পরিপূর্ণ ধারণা থাকতে হবে।

ধর্ষনের কারণ

বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষগুলোই ধর্ষণে লিপ্ত হয়। তদের এই মস্তিষ্ক বিকৃতির পিছনে আমাদের পরিবার এবং সমাজ অনেকাংশে দায়ী। এখানে কিছু গুরুতর কারন ব্যাখ্যা করলাম-

অপসংস্কৃতির প্রয়োগঃ
ছোটবেলা থেকে আমরা যেসব সিনেমা দেখে আসছি সেখানে খুব পরিচিত একটা দৃশ্য হচ্ছে এমন যেখানে নাইকার অনিচ্ছাতেও নায়ক তাকে অনুসরণ করছে, উত্ত্যক্ত করছে, বিভিন্ন মন্তব্য ছুড়ে দিচ্ছে, এমনকি গায়ে হাত তুলছে, এবং সবশেষে তাদের প্রেমও ঘটে যাচ্ছে। যেহেতু আমাদের সমাজে সিনেমা বিনোদনের একটা বিশাল জায়গা দখল করে আছে, তাই খুব সহজেই এর প্রভাব পড়ে সর্বত্র। এইসব দেখে সকলের ধারণা জন্মে যায় যে এইসব আচরণ সঠিক এবং হিরোইক। এর ভিতর এগুলোই আমাদের মস্তিষ্ক বিকৃতির প্রধান কারণ। যার ফলে মাদ্রাসার হুজুর, চার্চের ফাদার পর্যন্ত ধর্ষক হয়ে উঠার ঘটনাগুলো ঘটছে।

ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাঃ
ইন্টারনেট এমন এক বিস্ময় যা করে দিয়েছে আমাদের জীবন জাদুর মতন সহজ, খুলে দিয়েছে বহু দরজা। এর বহুমুখী ব্যবহার যেমন মিটিয়েছে আমাদের জীবনের নানা সমস্যা ঠিক এর কালো থাবাও গেড়েছে অভিশাপের মতন কোথাও কোথাও। ইন্টারনেট এমন একটি মাধ্যম যেখানে আপনি আপনার পছন্দ মতন ব্যবহার করতে পারবেন যেকোন কাজে। কোন সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারের কাজ থেকে শুরু করে সাইবার বুলিং বা এরচেও ভয়াবহ কোন কাজে।
খেলাধুলার জায়গার অপর্যাপ্ততা এবং পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়ে যাওয়ার ফলে শিশু-কিশোররা ঝুকছে ইন্টারনেটের দিকে। সুষ্ঠ পর্যবেক্ষণের অভাবে তারা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে সকল প্লাটফর্মে। যা তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশ, স্বাভাবিক বিবেচনা নষ্ট করে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। এমনকি অনেক ঘটনায় দেখা যায় একজন নাবালক কিংবা কিশোরকে রেপিস্ট হিসেবে।

মাদক দ্রব্যের অবাধ ব্যবহারঃ
আমাদের দেশে মাদক উতপাদন না হলেও সীমান্তপথে এর অবৈধ চালান ঘটছে প্রতিনিয়ত, এবং দিনদিন মাদকাসক্তের পরিমানও বাড়ছে। সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হচ্ছে কিশোর এবং তরুণ সমাজ। মাদকদ্রব্য ধীরে ধীরে চিন্তা-ভাবনাশক্তি দুর্বল করে দেয়, মানুষ ন্যায়-নীতির সঙ্গা হারিয়ে ফেলে ফলে সমাজে বিভিন্ন ধরনের ক্রাইম বাড়তে থাকে। কিন্তু মাদক দমনে সরকারের পদক্ষেপ তেমন কোন কার্যকরী ফল দিতে পারে নি।

পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষাঃ
সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিকতা এখন সামাজিক ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। মেয়েদের যোগ্য সম্মান না দেয়া, অবহেলিত এবং দুর্বল প্রতিপন্ন করা একটা হয়ে গেছে একটা খুবই সামান্য ব্যাপার। এইসব দেখে বেড়ে ওঠা শিশুগুলো নারী’দের আলাদা মানুষ বলে গণ্য করার মূল্যবোধ হারায়। ফলে মেয়েরা আজনম হয় নিগৃহীত ও নিপীড়িত। আমাদের সমাজ কখনোই নারীদের সম্মান করেনি এবং সবসময় তাদের দোষ খুঁজে বেড়িয়েছে, পদে পদে বাধা সৃষ্টি করেছে। এই সমাজ নারীকে শুধুমাত্র উপভোগের বস্তুই বানিয়ে রেখেছে, মানুষ হিসেবে কখনো তাদের কোন অধিকার দেয়নি।

প্রেমের প্রস্তাবে ব্যর্থ হওয়াঃ
বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ দেখে ছেলেপেলেরা শিখে গিয়েছে কিভাবে মেয়েরা প্রেমের ফাঁদে পড়ে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। তাই তারা নানা কায়দায় মেয়েদের প্রেমের প্রস্তাব দিতে থাকে এবং উত্যক্ত করে। যখন তারা ব্যর্থ হয় তখন রেইপের মত ঘটনাগুলো ঘটাতে উদ্ধত হয়। একই কারণে এক সময় এসিড নিক্ষেপের ঘটনাগুলো ঘটত।

ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিচারহীনতাঃ
মানুষ যখন ক্ষমতাশীল হয়ে যায় এবং কোথাও জবাবদিহি করার থাকে না তখন তারা হয়ে ওঠে বেপরোয়া, যত্রতত্র ঘটতে থাকে অপরাধ্মূলক কর্মকান্ড। বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যাবে এটা কত ভয়াল রূপ নিয়েছে। এই যে ধর্ষনের পরিমাণ বাড়ছে তার মূল কারণ হল বিচারহীনতা। আমরা নিয়মিত ধর্ষণের খবরগুলো পাচ্ছি কিন্তু কোন ঘটনার বিচার হয়েছে এমন কোন খবর পাচ্ছি না। ফলে রেপিস্টদের মনে এই ধারণা জন্ম হয়ে গিয়েছে যে ধর্ষণের কোন শাস্তিই নেই। ধর্ষকদের পুলিশ গ্রেফতার করেছে কিন্তু জামিনে ছাড়া পেয়ে আবারও ধর্ষণ করেছে এরকম ঘটনা বহুবার ঘটেছে।

ধর্ষণের ১৩ বছরঃ ঘনীভূত হতে থাকা এই অন্ধকারে আলো আসবে কবে?

উপরে বর্ননা করা বিষয়গুলো থেকে ধর্ষনের কারন এখন আমাদের কাছে মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। বছরের পর বছর ক্রমাগত ঘটতে থাকা ধর্ষণের ঘটনায় সবাই ধরেই নিয়েছে ধর্ষণ এখন অপ্রতিরোধ্য। তাই এই বিষয়ে কেউ কোন কথা বলতে চায় না, মনোবল ভেঙ্গে গিয়েছে অনেকখানি। কিন্ত না, ধর্ষণ  সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব! শুধুমাত্র বিচার ব্যবস্থাই ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে পারবে না। ধর্ষণ প্রতিরোধ করার জন্য কি কি পদক্ষেপ নিতে হবে তা নিচে তুলে ধরা হলো-

ধর্ষণ প্রতিরোধ করার উপায়

  • প্রতিটি ব্লগ, নিউজ পোর্টাল, সংবাদ মাধ্যম, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত ধর্ষণবিরোধী প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে।
  • সঠিক যৌনশিক্ষার প্রচলন বাড়াতে হবে।
  • ধর্ষণে উষ্কানিমূলক সিনেমা, নাটক ইত্যাদি বয়কট করতে হবে এবং টেলিকাস্ট রোধ করতে হবে।
  • ছেলেমেয়েদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য স্কুল কলেজে ধর্ষণ, হ্যা্রাসমেন্ট, সেক্সুয়াল এবিউজ সম্পর্কে বিস্তর ধারণা দিতে হবে।
  • পরিবারে শিশুদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের কিভাবে সম্মান করতে হবে সেই শিক্ষা দিতে হবে।
  • ধর্ষনের শাস্তির জন্য আলাদা ট্রাইবুনাল গঠন করতে হবে। ট্রাইবুনালে সর্বোচ্চ ৩০দিনের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
  • ধর্ষনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত করতে হবে।
  • সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং ধর্ষণের কারণ হিসেবে কখনোই নারীকে দায়ী করা যাবে না। কারণ এটি রেপিস্টদের মনে সাহস যোগায়।
  • প্রতিটি সমাজে এন্টি হ্যারেজমেন্ট কমিটি গঠন করতে হবে যে কমিটিতে ৭০% নারী থাকবে। তারা ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, চাইল্ড এবিউজ এসব বিষয়ের বিরুদ্ধে কাজ করবে। এসবের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
  • মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রনের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এর ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
  • পরিবারের সকলের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য পরিবারের সকলের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
  • বিচারবিভাগকে স্বাধীন হতে হবে। কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে সেজন্য সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
  • আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই একসাথে সাংঘঠনিক ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে যেন কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে।
  • পর্দা না করা যে ধর্ষিতা হওয়ার কারণ এ ভুল ধারণা থেকে সবাইকে বেড়িয়ে আসতে হবে। কারন এতে কেউ কেউ মনে মনে ধর্ষণ করার লাইসেন্স পেয়ে যায়।
  • ধর্ষণ মামলার জন্য পুলিশের আলাদা ব্রাঞ্চ করতে হবে। পাড়া, মহল্লা, গ্রামে শহরে ধর্ষণবিরোধী প্রচারণা, বিলবোর্ড স্থাপন করতে হবে। এতে ধর্ষণ সম্পর্কে মানুষ সচেতন হবে এবং পটেনশিয়াল রেপিস্টদের মনে ভীতির সঞ্চার হবে।
  • শিশুদেরকে যৌন শিক্ষা প্রদান করতে হবে। তার কিভাবে এবিউজড হতে পারে সে বিষয়ে ধারণা দিতে হবে।
  • বেকারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয় এবং নৈতিক অবক্ষয় ঘটে। দরিদ্রদের আয় রোজগার বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে হবে যেন তারা পরিবার নিয়ে সুখে সাচ্ছন্দে দিন যাপন করতে পারে।
  • পর্নোগ্রাফী পুরোপুরি ভাবে বন্ধ করতে হবে।
  • মিউচুয়াল কন্সেন্ট এবং জোরপূর্বক যৌন মিলনের পার্থক্য বুঝাতে হবে জনসাধারণকে। এ বিষয়ে শিক্ষার মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে।

ধর্ষণ প্রতিরোধ করতে হলে এখন থেকেই আমাদের পুরোদমে সোচ্চার হতে হবে, গড়ে তুলতে হবে গণসচেতনতা। নারীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তারা যেন কোথাও হ্যারেজমেন্ট এর শিকার না হয় সেদিকে কড়া নজরদারি করতে হবে। এ বিষয়ে পাঠকের মন্তব্য আশা করছি।

Rajib Ahamed Sujan

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে পড়াশুনা করছি।পড়াশুনার পাশাপাশি লেখালিখি করি।গল্প,কবিতা,আর্টিকেল ইত্যাদি।বই পড়তে অনেক ভালোবাসি।আমার অবসর সময়টা লেখালিখি আর বই পড়ে কেটে যায়।
| Follow me on Facebook

Leave a Reply