জোয়ার ভাটা কিভাবে ঘটছে? কি বলে বিজ্ঞান?

২০১৮ সালে কক্সবাজার-সেন্টামার্টিন ট্যুরে গিয়েছিলাম। ভরপুর জোছনায় সেন্টমার্টিনে এক রাত কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিল। এক রাতে যে সৌন্দর্য অবলোকন করেছিলাম সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। এই সৌন্দর্য অবলোকন করতে স্বশরীরে সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে। সেই রাতে অনেক সুখস্মৃতির সাথে একটা দুঃস্মৃতি নিয়ে এসছিলাম। আমার অনেক সাধের ফোনকে সেন্টমার্টিনের জোয়ারের নোনা পানিতে স্নান করিয়েছিলাম। সমুদ্র থেকে অনেকটা দূরেই ছিলাম। কিন্তু পানি যে এমন হুট করে এতটা দূরে এসে যাবে তা চিন্তার বাইরে ছিলো। আমরা যারা সমুদ্র তীরবর্তী বাসিন্দা নই আমাদের জন্য জোয়ারে পানির এতটা বৃদ্ধি অস্বাভাবিকই বটে কিন্তু যারা ঐ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা তাদের ভাষ্যমতে এই ঘটনা খুবই স্বাভাবিক এবং সত্যিটা হলো হ্যাঁ, খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। তাহলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই ধারণা হয়ে গেছে আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। জোয়ার-ভাটা, কেন হয় এবং এর পিছনে বিজ্ঞান কি ব্যাখ্যা প্রদান করে তাই জানবো আজকের আলোচনায়।

তাহলে প্রথমেই জেনে নেয়া যাক জোয়ার এবং ভাটা কি?

জোয়ারঃ চাঁদের আকর্ষণে (সূর্যের আকর্ষণও কাজ করে কিন্তু চাঁদের আকর্ষণটাই মূখ্য) সমুদ্রের পানির নিয়মিত বিরতিতে ফুলে ওঠার ঘটনাকে জোয়ার বলে।

ভাটাঃ ফুলে ওঠা পানি আবার নেমে যাবার ঘটনাকেই ভাটা বলে।

দুটো ঘটনাকে একত্রে বলা হয় জোয়ার-ভাটা।

এখন আমরা ধাপে ধাপে জানবো জোয়ার-ভাটার কারণ। জোয়ার-ভাটার কারণ হিসেবে আধুনিক বিজ্ঞান কি বলছে…..

এক মহূর্তের জন্য চিন্তা করে নেই পৃথিবীর আশে পাশে চাঁদ বা সূর্য বলতে কিছু নেই। কিছুটা নিচের ছবির মত।

নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুসারে, “এই মহাবিশ্বের প্রতিটা বস্তুকণা একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করছে”। যেহেতু পৃথিবীর আশে পাশে চাঁদ বা সূর্য নেই তাহলে পৃথিবীর উপর কোন কিছুর আকর্ষণ বল কাজ করছে না। তখন পৃথিবী এবং তার উপরিভাগের পানিকে আমরা উপরের ছবির মত চিন্তা করতে পারি।

এখন আমরা পৃথিবীর নিকটে চাঁদকে নিয়ে আসবো। চাঁদকে নিয়ে আসার ফলে যেটা হবে সেটা হচ্ছে পৃথিবীর উপর চাঁদের একটা আকর্ষণ বল কাজ করা শুরু করবে। এই আকর্ষণ বলের কারণে যেটা হবে সেটা হচ্ছে পৃথিবীর যে দিকে চাঁদ থাকবে সেই দিকেই সমুদ্রের পানি চাঁদের দিকে ফুলে উঠবে। আমরা এটাও জানি দূরত্ব যত বেশি হবে আকর্ষণ বলের মান তত কমবে। তাই এখন আমরা দূরত্ব অনুযায়ী পৃথিবীকে ১,২,৩ এই তিনটা পয়েন্টে ভাগ করে ফেলবো।

তাহলে যেটা হবে,

১ নং অংশটি চাঁদের সবচেয়ে কাছে থাকায় সেই অংশের পানি চাঁদের আকর্ষণের কারনে তার কাছাকাছি বেশি যায়। ২ নং অংশটি অর্থাৎ আমাদের পাথর, মাটির পৃথিবী ১ নং অংশের চাইতে কম যায় এবং ৩ নং অংশটি ১ ও ২ নং অংশ থেকেও কম কাছাকাছি যায়। চাঁদের আকর্ষণের কারনে ২ নং অংশটি যদি চাঁদের দিকে এগিয়ে না যেতো তাহলে আমরা পৃথিবীর এক দিকে জোয়ার এবং একদিকে ভাটা হতে দেখতাম। কিন্তু ২ নং আংশটিও যখন চাঁদের আকর্ষণে চাঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন আমরা পৃথিবীর একই সাথে পৃথিবীর দুই পাশে দুইটি জোয়ার এবং দুই পাশে দুইটি ভাটা হতে দেখি।

১ নং অংশের জোয়ারকে বলা হয় মূখ্য জোয়ার এবং ৩ নং অংশের জোয়ারকে বলা হয় গৌণ জোয়ার।

এখন প্রশ্ন হলো শুধু কি চাঁদের আকর্ষণ বলই পৃথিবীর উপর কাজ করছে? সূর্য এত বড় তাহলে সূর্য কি দোষ করলো?

না, সূর্য কোন দোষ করেনি। পৃথিবীর উপর সূর্যের আকর্ষণ বলও কাজ করছে। কিন্ত তা চাঁদের মত এতটা শক্তিশালী নয়। যার প্রধান কারণ হচ্ছে দূরত্ব। সূর্যের দূরত্ব পৃথিবীকে অনেক বেশি কিন্তু চাঁদের দূরতে পৃথিবী থেকে কম। কিন্তু দূরত্ব বেশি হবার কারণে যে জোয়ার-ভাটার উপর সূর্যের কোন প্রভাব কাজ করেনা তা কিন্তু নয়। সূর্যেরও প্রভাব আছে জোয়ার-ভাটার উপর। একটু আগে আমরা পৃথিবীর বাইরে চাঁদকে নিয়ে এসেছিলাম এখন আমরা সূর্যকে নিয়ে আসবো।

আমরা জানি আমাবস্যা এবং পূর্ণিমার সময় পৃথিবী, চাঁদ এবং সূর্য একই সরলরেখায় থাকে। যার ফলে ঐ সময়ে পৃথিবীর উপর একই দিকে চাঁদ এবং সূর্যের মিলিত আকর্ষণ কাজ করে। এই মিলিত আকর্ষণের ফলে প্রবল জোয়ারের সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর যে দিকে অমবস্যা সেদিকেও, যেদিকে পূর্ণিমা সেদিকেও। দুই দিকেই প্রবল জোয়ারের কারণে জোয়ারে পানি অন্য দিনের জোয়ারের পানির চাইতেও বেড়ে যায় এবং ভাটার পানি অন্যদিনের ভাটার পানির চাইতেও কমে যায়।

জোয়ার ভাটা ব্যাখ্যা

পূর্ণিমা এবং অমাবস্যাতে এই প্রবল জোয়ারকে বলা হয় ভরা কোটাল বা ভরা জোয়ার।

আমরা জানি, চাঁদ পৃথিবীকে পুরো একবার ঘুরে আসতে প্রায় ২৮ দিন সময় নেয়। আমরা আমাদের সুবিধার্তে ৩০ দিন ধরে নিলাম। ছোটবেলায় আমরা পড়তাম পক্ষ ২টি। অনেকেই ভাবতাম একটা নিজের পক্ষ আরেকটা প্রতিপক্ষ। কিন্তু ঠিক তার পরেই পড়তাম ১ মাসে পক্ষ ২টি। এটা পড়ার পরেই গন্ডগোল হয়ে যেত, মাসের মধ্যে কিভাবে নিজের পক্ষ আর প্রতিপক্ষ হয়? তারপর জানলাম যে একটা কৃষ্ণপক্ষ আরেকটা শুক্লপক্ষ।

একদম সহজ করে বলতে পূর্ণিমার আগের ১৪দিন শুক্লপক্ষ আর অমাবস্যার আগের ১৫দিন কৃষ্ণপক্ষ। উপরের ছবিতে চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের সাপেক্ষে যে অবস্থানে আছে সেই অবস্থানে অমাবস্যা হয় এবং এর পরেরদিন থেকেই শুক্লপক্ষের শুরু। চাঁদ অমবাস্যার যে অবস্থানে আছে ঘুরে তার বিপরীত অবস্থানে যেতে ১৫ দিনের মত সময় নেয়। তখন হয় পূর্ণিমা এবং তার পর দিন থেকেই কৃষ্ণপক্ষের শুরু।

৭.৪ বা প্রায় ৮ দিনে চাঁদ নিচের ছবির উপরের অবস্থানে পৌছে এবং যেই দিন পৌছে সেই দিনটাকে বলা হয় শুক্লপক্ষের অষ্টমি তিথি। এই দিন চাঁদ ও সূর্য পৃথিবীর সাথে ৯০ ডিগ্রী কোন তৈরি করে।

৯০ ডিগ্রী কোণে অবস্থান করার কারণে পৃথিবীর উপর চাঁদ এবং সূর্যের আকর্ষণ বল দুই দিকে কাজ করে। যার ফলে জোয়ারের পানি ভরা কোটালের মত বৃদ্ধি পায় না। তার সেই সময়ের জোয়ারকে বলা হয় মরা কোটাল। ঠিক একই ঘটনা ঘটে কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমি তিথিতে। যখন চাঁদ উপরের ছবির নিচের অবস্থানে পৌছায়। অর্থাৎ এক মাসে দুটি ভরা কোটাল এবং দুটি মরা কোটাল দেখা যায়।

এখন আমরা যদি সময় নিয়ে কথা বলি অর্থাৎ দুটো জোয়ারের ব্যবধান কতক্ষণ বা দুটো ভাটার মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত?

কোন স্থানে একটি মূখ্য জোয়ারের ১২ ঘন্টা ২৬ মিনিট পরে আরেকটি গৌণ জোয়ার হয় এবং একটি জোয়ারের ৬ ঘন্টা ১৩ মিনিট পরে হয় ভাটা হয়। যার মানে একটি মূখ্য জোয়ারে ২৪ ঘন্টা ৫৬ মিনিট পরে আরেকটি মূখ্য জোয়ার হয়।

তাহলে এই হচ্ছে জোয়ার-ভাটার পেছনের কারণ। অর্থাৎ, চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ বলের কারণের পৃথিবীতে জোয়ার ভটার সৃষ্টি হয়। জোয়ারের সময় পৃথিবীতে নতুন করে পানি আসেও না ভাটার সময় আবার সেই পানি পৃথিবী থেকে চলেও যায় না। পুরো ঘটনাই মহাজাগতিক আকর্ষণের ফলাফল।

Mithun Das

অতি সুন্দর কিন্ত সংক্ষিপ্ত জীবনে সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকাটাই মূখ্য। কে জয়ী হলো কে হারলো সেটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে উপভোগ করাই শ্রেয়। রহস্যময় প্রকৃতির রহস্যের চাদরে আচ্ছাদিত এই মানবজীবনের শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকতে চাই নিজের মত করে।
| Follow me on Facebook

This Post Has One Comment

  1. Hasnat

    Thanks ভাই। ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বোঝানোর জন্য।

Leave a Reply