চাঁদ কেন বাড়ে কমে

সুকুমার রায়ের “ষোল আনাই বৃথা” কবিতাটা আমরা ছোটবেলায় হয়ত অনেকেই পড়েছি। সেখানে প্রথম কয়েকটি লাইন এমন ছিলো যে,

বিদ্যে বোঝাই বাবুমশাই চড়ি সখের বোটে, মাঝিরে কন, ”বলতে পারিস সূর্যি কেন ওঠে? চাঁদটা কেন বাড়ে কমে? জোয়ার কেন আসে?” বৃদ্ধ মাঝি অবাক হয়ে ফ্যালফ্যালিয়ে হাসে। বাবু বলেন, ”সারা জীবন মরলিরে তুই খাটি, জ্ঞান বিনা তোর জীবনটা যে চারি আনাই মাটি।” 

বাবুমশাই সেদিন থেকেই আমাদের মনে একটা জিনিস গেথে দিয়েছিলেন যে সূর্য ওঠা, চাঁদের বাড়া কমা, জোয়ারের আসা যাওয়া এসব ব্যাপার গুলো না জানলে জীবনটা ষোল আনাই বৃথা। আজকেই এই আর্টিকেলে আমি আপনার জীবনের ৪ আনা সফল করার চেষ্টা করবো। হ্যাঁ, আজকের এই লম্বা আর্টিকেলে আমরা জানবো বাবুমশাইয়ের সেই রহস্যময় প্রশ্নের উত্তর “চাঁদটা কেন বাড়ে কমে”।

চাঁদের তৈরি হওয়ার ব্যাপারটা বিজ্ঞানীদের জন্য সবসময়েই একটা মধুর রহস্য হয়ে ছিলো। চাঁদ তৈরি হয়েছে যখন একটা ছোটো গ্রহ পৃথিবীর সাথে ধাক্কা খেয়েছে। সেই গ্রহটার আকার হয়তো মঙ্গলের সমান। এই সংঘর্ষের ফলে প্রচুর পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে মেঘের মত তৈরি করেছিলো, সেগুলোর অনেকগুলো চক্কর খাচ্ছিলো পৃথিবীকে ঘিরে, এবং সেগুলোই শেষ পর্যন্ত জড়ো হয়ে জমাট বেঁধে চাঁদে পরিণত হয়েছিলো।

চাঁদ  পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং সৌর জগতের পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চাঁদের কেন্দ্রের গড় দূরত্ব হচ্ছে ৩৮৪,৩৯৯ কিলোমিটার (প্রায় ২৩৮,৮৫৫ মাইল) যা পৃথিবীর ব্যাসের প্রায় ৩০ গুণ। চাঁদের ব্যাস পৃথিবীর ব্যাসের এক-চতুর্থাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। চাঁদের আয়তন পৃথিবীর আয়তনের ৫০ ভাগের ১ ভাগ। এর পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বল পৃথিবী পৃষ্ঠে অভিকর্ষ বলের এক-ষষ্ঠাংশ। পৃথিবী পৃষ্ঠে কারও ওজন যদি ১২০ কেজি হয় তা হলে চাঁদের পৃষ্ঠে তার ওজন হবে মাত্র ২০ কেজি । এটি প্রতি ২৭.৩২১ দিনে পৃথিবীর চারদিকে একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করে।

 চাঁদের নিজস্ব আলো নেই । তাহলে চাঁদ কে আমরা উজ্জ্বল দেখি কেন ? চাঁদ এর পৃষ্টে যখন সূর্যের আলো পড়ে তখন চাঁদ সেই আলো প্রতিফলিত করে । সেই প্রতিফলিত আলোই আমরা দেখতে পাই । আমাদের পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, যার ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় একই সময়ে দিন , অপর জায়গায় রাত হয় । একইভাবে চাঁদ আমাদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিন করে । ফলে চাঁদের পরিবর্তিত অবস্থানের কারণে সূর্য তার বিভিন্ন অঞ্চলকে আলোকিত করে ।

চাঁদকে দেখে শান্ত মনে হলেও তা পূর্বদিকে ৩,৬৮২ কি.মি./ঘন্টা বেগে ভ্রমণ করছে । আপনি হয়ত খেয়াল করেছেন যে চাঁদ সর্বদা আমাদের দিকে একই মুখ রাখে। এর কারণ চাঁদ ২৭ দিন ৭ ঘন্টা পর আবার একই অবস্থানে ফিরে আসে ।

চাঁদ একটা গোলক ।  সেটা সবসময়েই গোলকই থাকে। যখন চাঁদের পিছন থেকে সূর্যের আলোটা এসে পড়ে সেটাকে দেখা যায় না, পাশ থেকে আলো পড়লে খানিকটা দেখা যায় আর সামনে থেকে আলো পড়লে পুরোটা দেখা যায়। তাই কোথা থেকে সূর্যের আলোটা আসছে তার ওপর নির্ভর করবে চাঁদটা কত বড় দেখাবে।

চাঁদের বিভিন্ন পর্যায়গুলো বুঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে পরিষ্কার রাতে আকাশে চাঁদ থাকাকালীন নিয়মিত বের হয়ে পর্যবেক্ষন করা ।

পৃথিবী থেকে আমরা কখনো-কখনো পুরো চাঁদকে দেখার সুযোগ পাই, কখনো আংশিক দেখার সুযোগ পাই, কখনো-কখনো একটুও দেখতে পাই না তার কারণ – চাঁদটা স্থির নয়, এটা পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে।  পৃথিবীটাও যেহেতু স্থির হয়ে নেই, সেটিও সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে তাই সেটা সরে যায়। এ কারণে চাঁদকে আরো খানিকটা বাড়তি দূরত্ব ঘুরতে হয়, তাই পৃথিবী থেকে আমাদের মনে হয় পুরো পৃথিবী ঘুরে আসতে চাঁদ সময় নেয় সাড়ে ঊনত্রিশ দিন।

 অমাবস্যার সময় চাঁদটা দেখার উপায় নেই। কারণ তখন চাঁদের অন্ধকার পৃষ্ঠটা পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে। তারপরও যদি কেউ চাঁদকে দেখার চেষ্টা করে সেটা করতে হবে দিনের বেলায়! পূর্ণিমার রাতে সূর্যের আলো পড়ে পুরোপুরি আলোকিত চাঁদের পৃষ্ঠটা পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে এবং সারারাত সেটা দেখা যায়।

শুক্লপক্ষে (সরম্ন চাঁদটা যখন বড় হতে হতে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে যায়) চাঁদের ডান পাশ আলোকিত হয়। আবার কৃষ্ণপক্ষে (যখন পূর্ণিমার চাঁদ ছোট হতে হতে অদৃশ্য হয়ে যায়) পৃথিবীপৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা একজনের মনে হবে, চাঁদের বাঁ-পাশটা আলোকিত হয়ে আছে। অর্থাৎ আমরা যদি নাও জানি তাহলেও আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ডানদিক না বাঁদিক আলোকিত সেটি দেখে বলে দিতে পারব এটি কী শুক্লপক্ষ নাকি কৃষ্ণপক্ষ।

কেন সূর্যগ্রহণ হয় অমাবস্যায় আর চন্দ্রগ্রহণ হয় পূর্ণিমায়। কারণ অমাবস্যার দিনের বেলাতেই একটা চাঁদ সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে এসে সূর্যটাকে আড়াল করে দিতে পারে – অন্য কখনো না। আবার পূর্ণিমার সময়েই শুধুমাত্র পৃথিবীর ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে একটা চন্দ্রগ্রহণ করতে পারে, অন্য কখনো না। 

সহজ কথা অনেক হলো এবার একটু বিশ্লেষণে যাওয়া যাক ।

New Moon বা অমাবস্যা হলো চাঁদের প্রথম দশা । তখন পৃথিবী ও সূর্যের সংযোগকারি সরলরেখার ঠিক মাঝখানে থাকে চাঁদ । যার ফলে চন্দ্রের যে অংশটি আলোকিত হয় তা থাকে পৃথিবীর বিপরীত দিকে । তখন পৃথিবী থেকে চাঁদ কে অন্ধকার দেখা যায় । এই অবস্থা কে  আমরা বলি New Moon বা অমাবস্যা ।

চাঁদ যখন ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবী এর সাথে ৪৫º কোণে অবস্থান করে ,তখন সেই অবস্থাকে বলা হয় Waxing Crescent Moon. তখন চাঁদের যে অংশটি সূর্যের আলোয় আলোকিত হয় সে অংশটি আমরা দেখতে পাই । অর্থাৎ চাঁদ পৃথিবীর সাথে ৪৫º কোণে অবস্থান করার সময় চাঁদের যে আলোকিত বাঁকা অংশটি আমরা পৃথিবী থেকে দেখতে পাই । একে আমরা বাঁকা চাঁদ ও বলে থাকি।

চাঁদ যখন ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর সাথে ৯০º কোণে অবস্থান করে সেই অবস্থাকে First Quarter বলে। তখন সূর্যের আলোয় চাঁদের আকৃতি দেখা যায় অর্ধগোলাকার ।

চাঁদ আরো কিছুটা ঘুরে পৃথিবীর সাথে ১৩৫º কোণে অবস্থান করে তখন তার অবস্থাকে বলা হয় Waxing Gibbous . তখন আমরা পৃথিবী থেকে চাঁদের ডানদিকের অধকাংশই দেখতে পাই।

চাঁদ যখন আরো ঘুরে ১৮০º কোণে অবস্থান করে সেই অবস্থাকে বলা হয় Full Moon বা পূর্নিমা । তখন চাঁদের যে অংশ আলোকিত হয় তার পুরোটাই পৃথিবী থেকে দেখতে পাই । এবং পৃথিবী থেকে মনে হয় সম্পূর্ন চাঁদটাই বুঝি আলোকিত। মনে প্রশ্ন আসতে পারে সুর্যের আলো পৃথিবী ভেদ করে কি করে চাঁদে পৌছায় ? উত্তরটা খুব সহজ । যখন অমাবস্যা হয় তখন কিন্তু চাঁদের ছায়া পৃথিবীতে পড়ে না। আবার সুর্য পৃথিবী হতে ১৩ লক্ষ গুন বড়। যার ফলে পৃথিবীর চতুর্দিক অতিক্রম করে  খুব সহজেই সুর্যের আলো চাঁদে পৌছাতে পারে । ফলে আমরা পূর্নাঙ্গ চাঁদ দেখতে পাই।

ঘুরে ঘুরে যখন চাঁদ ২২৫º কোণে অবস্থান করে , তখন আমরা চাঁদের বা দিকের অধিকাংশ দেখতে পাই। এই অবস্থাকে বলা হয় Waning Gibbus.

আর ঘুরে যখন ২৭০º তে চলে আসে তখন আমরা চাঁদের বা দিকের অর্ধেক অংশ দেখি। এই অবস্থার নাম Last Quarter .

এবং চাঁদের সর্বশেষ দশা Wanning Crescent .  আরো ৪৫º ঘুরে ৩১৫º তে অবস্থান করলে বা দিকে কিছু অংশ অর্থাৎ বা দিকে বাঁকা চাঁদ দেখা যায় ।

এভাবে ২৯ দিন পরপর নিজ অক্ষে একবার করে পৃথিবিকে প্রদিক্ষন করে এবং নিজ দশার পুনারবৃত্তি ঘটায় ।

ব্ল্যাক মুন

চাঁদের অনুপস্থিতিকে ব্ল্যাক বলাই ভালো। এ সময় চাঁদ যেন লুকিয়ে থাকে। ব্ল্যাক মুনের নানা ধরনের সংজ্ঞার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্যটি হলো, যে মাসে কোনো পূর্ণিমা হয় না, সেই সময়কেই ব্ল্যাক মুন বলা হয়। ২৮ দিনের মাস হওয়ায়, এ ঘটনা কেবল ফেব্রুয়ারি মাসেই ঘটতে পারে৷ ১৯ বছর পর পর আসে ব্ল্যাক মুন৷ পরের ব্ল্যাক মুন আসবে ২০৩৭ সালে৷

সুপার মুন

পূর্ণিমার জোছনার ছটায় কোমল আদুরে স্পর্শে বিলিন হতে চায় সবাই। পূর্ণিমার সময়ে চাঁদ তার আলো কাছ থেকে ছড়াতে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে চলে আসে। এ সময় অন্যান্য সময়ের চেয়ে চাঁদ বড় দেখায় বলে তাকে সুপার মুন বলা হয়।

ব্লাড মুন

চন্দ্রগ্রহণ দেখতে অনেকেই তাকিয়ে থাকেন আকাশের দিকে৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাদা চাঁদের অংশবিশেষ বা পুরোটাই ঢেকে যায় পৃথিবীর কালো ছায়ায়৷ কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে গ্রহণের সময় চাঁদ ধারণ করে টকটকে লাল রং৷ আর এই গ্রহণকেই ডাকা হয় ব্লাড মুন নামে৷ গবেষকরা বলেন, পুরোপুরি পৃথিবীর ছায়ায় ঢেকে গেলেও এই গ্রহণে সূর্যের কিছু আলো ঠিকই পৌঁছে যায় চন্দ্র পৃষ্ঠে৷ এটিই এই লাল রঙের কারণ৷

ব্লু মুন

নাম ব্লু বা নীল। কিন্তু চাঁদের রঙ কি নীল হয়? হয় না। একই মাসে দু’বার পূর্ণিমা হলে, দ্বিতীয়টিকে বলা হয় ব্লু মুন৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য বাতাসে থাকা ধুলোবালি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক কারণে চাঁদ নীল রং ধারণ করে৷ কিন্তু সেটাকে ব্লু মুন বলা হয় না৷ প্রতি তিন বছরে একবার আসে ব্লু মুন৷

সুপার ব্লাড ব্লু মুন

বিরলেরও বিরল ঘটনা হলো সুপার ব্লাড মুন। আকাশের চাঁদ একই সাথে সুপার, ব্লাড ও ব্লু মুনের বৈশিষ্ট্য ধারণ করলে সেটাকে সুপার ব্লাড ব্লু মুন বলা হয়৷

মাসের দ্বিতীয় পূর্ণিমায় যখন চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি চলে আসে এবং তখন চাঁদ মামা টকটকে লাল রং ধারণ করে, তখন সেটিকে সুপার ব্লাড ব্লু মুন নামেই ডাকা হয়৷

This Post Has One Comment

  1. Ashiq Ahmed

    ওয়াও। দারুন লিখেছেন ভাইয়া। বিভিন্ন ফেজে চাঁদের এই নামকরণ গুলো কিসের ভিত্তিতে করা হয় সেটা নিয়ে একটা পোস্ট আশা করছি।

Leave a Reply